ফসলের মাঠে সূর্যমূখীর রাঙ্গা হাসি।

শফিউল আলম রাজীবঃ

দিগন্ত বিস্তারী সবুজ ফসলের মাঠ, তার বুকজুড়ে হলুদে রাঙ্গানো সূর্যমূখীর রাঙ্গা হাসি । এ যেন এক নতুন সূর্যের হাসি। এটি কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌর এলাকার গুনাইঘর গ্রামের নন্দীবাড়ির পূর্বপাশে ফসলের মাঠের দৃশ্য। দেবীদ্বার সদর থেকে প্রায় দেড় কিলো মিটার দক্ষিন-পশ্চিম কোনে অবস্থিত ওই এলাকা এখন সবার নজর কাড়ছে। মাঠে হলুদ ছড়ানো ‘সূর্যমূখী’ চাষ করা জমিকে ঘিরে এমন দৃশ্য। প্রতিদিন আশপাশ এলাকার নানা বয়সের মানুষ ছুটে আসছেন এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে। মাঝখানে একটুকরু তিলোত্তমায় রাঙ্গানো সূর্যমূখীদের হাসির দর্শনে এভাবেই ছুটে আসছেন ছোট বড় নানা বয়সের মানুষ।

পরিবার-পরিজন, প্রেমিক যুগল, বন্ধু-বান্ধব, সাংবাদিক সহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষের পদভারে ওই এলাকা এখন সবার পরিচিত। ছুটির দিন বা কাজের ফাঁকে এক নজর সূর্যের হাসি দেখতে যেয়ে মনোরম পরিবেশের সাথে নিজেকে ক্যামেরা বন্দী, সেলফি তোলার ক্লিকের শব্দ মোবাইল ভিডিওর ফ্লাশের ঝিলিক অহরহ চলছে।

কথা হল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বপরিবারে আসা এক দর্শনাথর্ীর সাথে। তিনি বললেন, আমাদের এ প্রজন্মের শিশু-কিশোরই নয়, সকল বয়সের লোকজনের বিনোদনের কোন স্থান নেই। এই মৌসুমে সুর্যমূখী ফসলের জমিকে ঘিরে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বিনোদনের কিছুটা ঘাটতি পুরন করছে। এখানে এসে সূর্যের হাসিখ্যাত সূর্যমূখীই নয়, নানা জাতের শব্জী ও ফসলের সাথে নতুন প্রজন্মের পরিচিতি হওয়ার সুযোগটাও যুক্ত হয়েছে।

এখানে শাকসব্জীর সবুজ মাঠে নানা ফসল যেমন, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম কপি, টমেটো, লাল শাক, মরিচ, ভুট্টা, কাওন, ধূন্দা, জব (ববি বার্লি), গম, গুল আলু, মিষ্টি আলু, লাউ, কোমড়া, শষা, ডাটা, উস্তা, করল্লা, ভেন্ডি (ঢেরস) সহ বিভিন্ন ফসলের এক সমাহার।

সূর্যমূখী ক্ষেতের পাশে দেখা হয় একজন মাঝ বয়সী লোকের। তিনিই সবুজের বুকে সূর্যমূখীর এ হলুদ হাসি ফুটানোর কারিগর। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, তার নাম আবু তাহের (৫০), এ গ্রামেই তার বাড়ি, পিতা মৃত: আব্দুল জলিলও একজন কৃষক ছিলেন। তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমি পাহারায় থাকেন। তিনি জানান, সকাল থেকে সারা দিন সূর্যমূখী ফসল দেখতে এবং ছবি তুলতে শত শত মানুষ এখানে ভীড় করেন। দিনভর পাহারায় থাকলেও আনন্দও লাগে। কারন তার এ সূর্যমূখী খেত দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে পরিবার পরিজন, বন্ধু বান্ধব সহ নানা বয়সী নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষ ভীড় করছেন। এ ক্ষেতের উছিলায় গ্রামটিও অনেকের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ এলাকায় অসংখ্য চটপটি, বাদাম, চা’ সহ নানা খাবারের পর্ষদ নিয়ে হকাররা বসেন, তাদেরও আয়ের একটি উৎস তৈরী হয়েছে। রিক্সা, সিএনজি, অটো রিক্সা, মোটর সাইকেলের বহরও থাকে বিশাল।

তিনি বলেন, নিজেদের সামান্য জমি থাকলেও ওই জমি চাষ করে সংসার চালানো সম্ভব নয়, তাই তাকে বন্ধকী এবং পত্তনী জমীর উপর নির্ভর করতে হয়।

তিনি আরো জানান, উপজেলা কৃষি বিভাগের তত্বাবধানে ‘সরেজমিন গবেষনা বিভাগ, বি,এ,আর আই কুমিল্লা’র তত্বাবধানে এক একর জমিতে সূর্যমূখী চাষের পরিকল্পনা নেয়। সে লক্ষে আমি আমার জমির সাথে আরো ৪৫ শতাংশ জমি ২০ হাজার টাকায় পত্তনে রাখি। কৃষি বিভাগ আমাকে বীজ, সার, কীটনাশক ঔষধ এবং পরামর্শদিয়ে পরীক্ষামূলক জাত ‘বারি সূর্যমূখী’-৩’র ব্লক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। শুধু মাত্র জমি শ্রম আমার এবং উৎপাদীত ফসল আমার, বাকী সব দেখভাল ও খরচ তাদের, তিনি এতে খুশী।

তবে তিনি শংকা পোষন করে বলেন, অন্যান্য উৎপাদীত ফসল নগদ বিক্রি করা যায়, বাজারজাত করার পূর্বেই জমি থেকেও ব্যবসায়িরা ফসল কিনে নেয়। সূর্যমূখী আমাদের এ এলাকায় উৎপাদন কম হয়, কৃষকের মধ্যে এখনো আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। সূর্যমূখীর তৈল সংগ্রহে কৃষি বিভাগের সহযোগীতা নিতে হবে। ফসল উঠার পর প্রক্রিয়াকরণে সহজ কিংবা লাভের হিসেব থেকেই চিন্তা করব, আগামীতে সূর্যমূখী চাষ করবেন কিনা।

গত বছরের ৬ ডিসেম্বর সূর্যমূখীর আবাদ শুরু করে, চলতি মার্চ মাসের শেষ দিকে ঘরে তুলব বলে আশা করছেন তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইদুজ্জামন জানান, পরীক্ষামূলক ‘সরেজমিন গবেষনা বিভাগ, বি,এ,আর আই কুমিল্লা’র তত্বাবধানে দেবীদ্বারের গুনাইঘর গ্রামে ‘সূর্যমূখীর ব্লক প্রদর্শনী করা হয়েছে। এর বিস্তার বৃদ্ধি, উপযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। ভোজ্য তেল সোয়াবিন নানা প্রক্রিয়াত কারনে অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ছে। সুর্যমূখী ভোজ্য তৈল হিসেবে স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী। অবশ্য এর ক্রচিং ইন্ডাষ্ট্রিজ নোয়াখালীতে আছে। আমাদের এখানকার সূর্যমূখীর বীজ নোয়াখালীর ক্রচিং ইন্ডাষ্ট্রিজে পাঠিয়ে ওখান থেকে পিষিয়ে তৈল বের করে আনতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের সূর্যমূখী আবাদে ব্যাপকভাবে কুষকদের উদ্ভোদ্ধ করতে হবে। এবং সূর্যমূখী চাষের জমি সার্বক্ষনিক পাহারায় রাখতে হবে। কারন, শুরুতে এবং ফলনের সময় পাখী ভুট্টার মতো খেয়ে ফেলে আর ফুলের পাপড়ি গজানোর পর উৎসাহী লোকজন ফুল হিসেবে ছিড়ে নিয়ে যায়। একারনে সব সময়ই পাহারায় রাখতে হবে।

You might also like
error: Content is protected !!