দেশে কোটিপতি বাড়লেও করোনায় কমছে।

এম এস দোহাঃ

দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তাদের মানবিক পদচারনা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। করোনাকালে কেন জানি তা ঠেকেছে অনেকটা তলানীতে।২০১৮ সালে দেশে কোটিপতি ছিলো ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন। ২০১৯ সালে তা ৮৩ হাজার ৮৩৯ উন্নীত হয়। ২০২০ জুন পর্যন্ত এ সংখ্যা পৌঁছে ১লাখে অর্থ্যৎ দেশে ৬ মাসে ১১ হাজার নতুন কোটিপতির উত্থান।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে ২২ কোটিপতি থেকে এখন আমাদের হাজার হাজার শিল্প গ্রুপের ছড়াছড়ি। অথচ করোনাকালে তারা রয়েছে দর্শকের ভূমিকায়। কেউ কেউ গর্তে লুকিয়ে।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, পরিসংখ্যানে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও করোনার কমেছে। আগে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃর্যোগে শিল্পপতিদের মানবিক কর্মকান্ড ও অস্তিত্ব বুঝা যেতো। কিন্তু করোনা মহামারীতে সবাই লকডাইনে। সব ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের একই সুর। নাই। খারাপ। বিপদে আছি। অথচ দেশের লক্ষাধিক কোটিপতির মধ্যে মাত্র ৬৪জন শিল্পপতি ইচ্ছে করলে চলমান চিকিৎসা ব্যবস্থার হাহাকার বহুলাংশে লাগব করতে পারতো। জেলায় একটি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের দায়িত্ব নেওয়াটা তাদের কোন ব্যাপার-ই ছিলো না। এখনও দেশের ৫৬টি জেলা সদরের হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর শূন্য। এরমধ্যে আবার অনেকে ব্যস্ত প্রণোদনার ব্যবসায়। করোনাকালে চিকিসা সেক্টরে নেমেছে লুটপাটের প্রতিযোগিতায়। রাতারাতি কোটিপতি স্বপ্ন।

যার প্রমাণ মিলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোভিড-১৯ চিকিৎসায় বিশেষ বরাদ্ধের ২শ কোটি টাকা হিসাব মিলাতে না পারার ঘটনায়। এই মহামারিতে স্বাস্থ্য সেক্টরের মাফিয়া কোটিপতির সংখ্যা আশাতীত বেড়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এস আলম গ্রুপ এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ শিল্প ও ব্যাকিং সেক্টরের নিয়ন্ত্রক। পরিচালক মোরশেদ আলম আইসিইউ’র অভাবে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে মারা যান। অনেকে আশা করেছিলো হয়তো এর পর চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে আইসিইইউ অভাব আর থাকবেনা। আবদুল মোমেন মৃত্যুর পর ব্রাক্ষ্মবাড়ীয়ার হাসপাতালগুলোতে সংকট থাকার কথা নয় করোনা চিকিৎসা সামগ্রীর। হাজী মকবুলের মৃত্যুর পর টাঙ্গাইলের হাসপাতালের চেহারা পাল্টে যাওয়ার কথা। নাশা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার অসুস্থ হওয়ার পরও এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার কোন উন্নতি হয়নি। সিরাজুল ইসলাম মোল্লা আক্রান্তের পর নরসিংদীর শিবপুর হাসপাতালের আসেনি করোনা চিকিৎসার কোন অনুদান। সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছেন তা নয়। বসন্ধরা গ্রুপের আইসোলেশন হাসপাতাল, টি.কে গ্রুপের ২০টি আইসিইউ অনুদান, আবুল খায়ের গ্রুপের অক্সিজেন-ঔষধ প্রদানে হটলাইন চালু’র মানবিক ইতিবাচক সংবাদও আছে। তবে এ সংখ্যা হতাশাব্যাঞ্জক।

করোনাকালেও কয়েককজন নব্য কোটিপতি এমপি আলোচনার ঝড় তোলে সংবাদ শিরোনাম হন তারা। মানিকগঞ্জের নাইমুর রহমান দূর্জয়, রাজশাহীর এনামুল হক ও লক্ষীপুরের পাপুল’র মানবিক কোন কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয়নি। বিত্তশালী অনেক রাজনীতিবীদ, মন্ত্রী, এমপিদের দেখা যায়নি নির্বাচনী এলাকার জনগনের জন্য কোভিড-১৯ মহামারিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে।ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান, ধনকুবের লতিফুর করোনাকালে প্রায় ৪মাস অবস্থান করেন গ্রামের চৌদ্দগ্রামের চিওোড়ায়। অথচ চৌদ্দগ্রামের মানুষ এই সময়ে তার কাছে কোন মানবিক ও সামাজিক সাহায্য পায়নি। চৌদ্দগ্রামে মারাগেলেও স্থানীয়ভাবে জানাযা নেননি তিনি। যা সামাজিক দৈন্যতার নজির হয়ে থাকবে।

অনেকে মনে করেছেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চার দেওয়ালে বন্ধি থেকে রক্ষা পাবেন। তাই জনসম্পৃক্তা এড়িয়ে চলা। কিন্তু অধিকতর নিরাপদ ও সচেতনতা অবলম্বন করেও রক্ষা হয়নি অসংখ্য অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা ও পদ-পদবী ধারীর। করোনায় আক্রান্ত হয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ও আইসিইইউ ভাগ্য জোটেনি অনেকের। ছুটে যেতে পারেনি বিদেশের হাসপাতালে। প্রকৃতির কাছে করেছে স্যারেন্ডার। নিরুপায় হয়ে বাংলাদেশের হাসপাতালে এখন চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি কোটিপতিরা। সামান্য এক অদৃশ্য ভাইরাস রাজপথ থেকে ফুটপাতের সবার জীবন পর্যবসিত করেছে অনিশ্চয়তার। অথচ এসব বিত্ত ও ক্ষমতাশালীরা চিকিৎসায় বিদেশমূখী নাথাকলে দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রভৃত উন্নয়ন অনেক আগেই সাধিত হত। যা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধিতে এসেছে সবার।

অপ্রিয় হলেও সত্য, করোনা আক্রান্ত ও সম্ভাব্য রোগীদের আশে পাশে যেতে নারাজ অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি। হাঁচি কাঁশি দেওয়া ভোটারের টেলিফোন ধরতেও ভয়পান তারা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে মন্ত্রী এমপি থেকে শুরু করে অনেক জনপ্রতিনিধি এখন লকডাউনে। জনগনের এই দুঃসময়ে মন্ত্রী-এমপিদের নিবাচর্নী এলাকার জনগন খুজে পাছেন না। করোনা সংকট মোকাবেলায় জেলার দায়িত্বে এখন সচিবরা। হাফছেড়ে বাঁচেন সংসদ সদস্যরা।

জাতীয় সংসদে ৩০জুন কিশোরগঞ্জের এমপি মজিবুল হক চুন্নু অভিযোগ করেন, খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন নাকি করোনার ভয়ে লোহার খাঁচায় লুকিয়ে আছেন। তাই হাসপাতালগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা স্বশরীরে পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণে নেই তার কোন কর্মকান্ড। ধন্যবাদ প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি করোনা রোগীদের খোঁজ খবর নিতে স্বশরীরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
করোনা কালে জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃব্য ও মানবিক দায়বদ্ধতা বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর খোরশেদ আলম। জাতীয় ও আর্ন্তজাতিকভাবে প্রশংসিত তার কর্মকান্ড। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শ্মশানে খোরশেদ কর্তৃক করোনা আক্রান্ত হিন্দু ব্যক্তির লাশের সৎকারের ছবি ডাচ্ রাজনীতিবিদ জোরাম জারন ভ্যান ক্লাভেরনের নজর কাড়ে। নরাডিয়ান এই এমপি তার ফেইসবুজ স্ট্যাটাসে লেখেন-‘ছবিগুলো বাংলাদেশ থেকে তোলা। যেখানে কভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে একজন হিন্দু ভাই মারা যান। তার সম্প্রদায়ের কিংবা পরিবারের কেউই ভয়ে অংশগ্রহণ করেনি সৎকার কাজে। খোরশেদের নেতৃত্বে একদল মুসলমান লাশটির সৎকারে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিয়ে তা সম্পন্ন করেছিলেন। এটি ইসলামের সম্প্রীতি ও শিক্ষার সত্য লক্ষণ। কিছুদিন আগে আমি ভারতের অনুরূপ সংবাদ পড়েছি। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি বেশি কিছু জানি না। আমি জানি এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।তারা এত ধনী নয়। তবে তাদের হৃদয় সমুদ্রের মতো। যারা প্রায় মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী দিয়েছেন আশ্রয়। আমি এই দেশকে এবং এর জনগণকে সালাম জানাতে চাই। ভারত কি তাদের কাছ থেকে কিছু শিখব?

মানবিক সেবা করতে গিয়ে অতপর স্বপরিবারে খোরশেদ কোভিড-১৯ পজেটিভ। শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শুরু হয় আইসিইউ জন্য তদরকি। অতপর সাংসদ শামীম ওসমানের সহায়তা স্কয়ার হাসপাতালের ভর্তি হন। তিন চিকিৎসার বিল দেখে অতঙ্কে ৬দিনের মাথায় তিনি হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হন। এশিয়া মহাদেশে প্রাচ্যের ড্যান্ডি হিসাবে খ্যাত নারায়নগঞ্জে এতো শিল্পপতি-কোটিপতি থাকলেও খোরশেদর পাশে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও করোনা মানবিকতায় যে কমেছে এটা্ও তার দৃষ্টান্ত। আবার টকশো বিশেষজ্ঞ শাহেদ রিজেন্ট হাপসাতালের মাধ্যমে করোনাকে পুঁজি করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। অবশ্যই জালিয়াতে দায়ে এ নব্যকোটিপতি এখন র‌্যাব’র নজরদারিতে।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, করোনাকালে দ্ররিদ্রের হার বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। বিআইডিএস এর গবেষণায় বলা হয়েছে, করেনা প্রভাবে চলতি বছর ১ কোটি ৬৪ লক্ষ মানুষ যুক্ত হয়েছে নতুন করে দারিদ্রের সারিতে। বছর শেষে দাদ্রিদ্রের হার ২৫শতাংশ ছাড়াতে পারে। করোনার আগে বেকার ছিল সাড়ে ১৭শতাংশ। এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে ১৩ শতাংশ। ফলে ৩০শতাংশ জনগোষ্ঠি এখন বেকারের তালিকায়। যার প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছ। চলমান আর্থসামাজিক অবস্থায় কুষ্টিয়ার মিরপুরের নন এমপি কলেজের সমাজ-বিজ্ঞানের প্রভাষক এখন জীবীকার তাগিদে বাজারে গরু ছাগলের ঔষধ বিক্রি করে। দিনাজপুরের পারবর্তীপুরের শিক্ষকের হাতে এখন কোদাল ঝুড়ি। মেহেরপুরের কিন্ডাগার্টেন শিক্ষক ইজিবাইক চালক। ঢাকা শহরের বাসাগুলোতে এখন টু-লেট ছড়াছড়ি। দেশের এই দু:সময়েও একশ্রেনীর মানুষ বিদেশে টাকা পাচার, নিরাপদ সেকেন্ড হোমের স্বপ্নোবিভোর। গত দশবছরে (২০০৬-২০১৫)বাংলাদশ থেকে পাচারকৃত অর্থ আমাদের বাজেটের সমান। একবছরের দেশে থেকে টাকা পাচার রোধ করাগেলে ৪টি পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব হতো। তাই সরকারের উচিত এসব কোটিপতিদের চিহ্নিত ও তদন্তের মাধ্যমে দেশকে সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা। সেই সাথে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র পীড়িত জনগনের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ।

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের করোনাকালে আত্মহত্যার ঘটনার প্রেক্ষাপট দিয়ে লেখাটির উপসংহার টানতে চাই। মৃত্যুকালে সুইসাইড নোটে তিনি লিখেছেন, “খ্যাতি আর টাকার পেছনে ছুটা একটা অসুখ আমি এখন ‘শুধু জীবনটা’ কাটাতে চাই। ভালো থাকতে চাই।”

লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক নতুন সময়।

আরো পড়ুন
error: Content is protected !!