কৃষি শ্রমিকদের আনার জন্য চাই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।

সৈয়দ নুরুর রহমানঃ

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার রাজাপাড়া গ্রামের বন্ধুজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এড. শহীদুল হক স্বপন, নাঙ্গলকোট থেকে বন্ধু এড. এম এ সোবহান দু’জনই নোটিশ করলেন কৃষকের ঘরে ঘরে হাহাকার। কৃষক বাঁচবে না, অনতি বিলম্বে যদি কৃষি শ্রমিক না পাওয়া যায়।
ভয়াল করোনার সর্বগ্রাসী থাবায় আজ বিপর্যস্ত আমাদের যাপিত জীবন। এর মাঝেও অশনি সংকেত হিসাবে দেখা দিয়েছে কৃষি শ্রমিক সংকট। ধান কাটা নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা যেন কাটছেই না। কৃষি শ্রমিক সংকটে আজ দিশেহারা কৃষক। প্রতিবছর উত্তরাঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার শ্রমিক ধানকাটার মহোৎসবে সামিল হতো। আর এবার উৎপাদিত ফসল জমিতেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাই আমাদের আশার একমাত্র বাতিঘর। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনাই জাতিকে আশার আলো দেখাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে কৃষি শ্রমিকদের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাইরের জেলার কৃষি শ্রমিকদের আনতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।


বোরো ধান কাটা মৌসুম পুরোদমে শুরু হবে আরো সপ্তাহখানেক পর। কিন্তু গ্রামে গ্রামে ধান কাটা শ্রমিক খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে কৃষকরা ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
প্রতি বছর পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, মাদারীপুর, দিনাজপুর, শরীয়তপুরসহ উজান এলাকা থেকে প্রচুর মৌসুমি কৃষি শ্রমিক ধান কাটতে যেত দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এবার করোনাভাইরাস সংক্রমণের শঙ্কায় ও লকডাউন থাকায় ধান কাটতে আসতে পারছেন না তারা। এই কৃষি শ্রমিকরা বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে
দলবেধে আসতো ধান কাটতে। কিন্তু এবার আসতে সমস্যা হচ্ছে। কিছু শ্রমিক নৌকায় করে আসার সময় বাধা পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। সড়কপথেও আসতে পারছেন না।

অনেক এলাকায় বাইরের জেলার শ্রমিকরা এখনো আসতে না পারায় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। সংবাদ মাধ্যমে দেখা যায়, পূর্বে কৃষকের কাছ থেকে অগ্রিম নেয়া অনেক শ্রমিক কৃষকদের জানিয়েছে, গাড়ি না পাওয়ায় তারা আসতে পারছেন না। পরিস্থিতি খুবই জটিল।
এদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে অন্তত ৩০/৩৫টি জেলা লকডাউন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে
ধান কাটা শ্রমিকদের লকডাউনের আওতামুক্ত ঘোষনা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কৃষি শ্রমিকদের আনার সমন্বিত ব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান না।
অন্যদিকে আমাদের রয়েছে উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতিরও স্বল্পতা। যার কারনে মাঠের ধান মাঠে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেশকে ঠেলে দেবে কঠিন পরিস্থিতির দিকে। শ্রমিক স্বল্পতায় শ্রমের মুল্য বেড়ে যাবে অনেকগুন। যা কৃষকের উৎপাদিত ফসলের মুল্য ছাপিয়ে যাবে। কৃষক ফসল কাটার উৎসাহ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।
এ চরম দুর্যোগে কিছু প্রস্তাবনা নিয়েও আমরা ভাবতে পারি-

* কৃষি সুপারভাইজার, আনসার ভিডিপি, বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বারদের সহযোগিতা নিয়ে এলাকায় এলাকায় ধান কাটা শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করা।
* কৃষি শ্রমিকদের প্রত্যয়নপত্র বা নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য সাময়িকভাবে কার্ড দেয়া।
* কৃষি শ্রমিকদের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের চাহিদা মতো এলাকায় পাঠানোর জন্য, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য তারিখ ঘোষনা করা।
* প্রতি উপজেলা থেকে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করা, প্রথমে জেলা সদরে পরে চাহিদা মতো জেলায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।
* আগে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের হাট বসতো। এবার হাট না বসিয়ে শ্রমিকদের কোন স্কুল ঘরে রেখে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাদের কৃষকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা
* কৃষি শ্রমিকদের নুন্যতম মজুরি ধার্য করে দেয়া, যাতে করে কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়।
* কৃষি শ্রমিকদের স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সামাজিক দূরত্ব মেনে রাতে থাকার ব্যবস্থা করা।
* ধান কাটার জন্য প্রশিক্ষিত আনসার ভিডিপি সদস্যদের কাজে লাগানো
* স্বেচ্ছাসেবীদের আহ্বান করা যেতে পারে ধান কাটার জন্য। গত বছর বাংলাদেশ ছাত্রলীগসহ অনেক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কৃষকের ধান কাটায় সহায়তা দেয়ার উজ্জ্বল নজিরও রয়েছে।

লেখকঃ সৈয়দ নুরুর রহমান।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা আইনজীবী সমিতি।

আরো পড়ুন
error: Content is protected !!