করোনায় সামাজিক দূরত্ব ও অমানবিকতা।

এম এস দোহা

 

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে, আমরা মানবিক ও সামাজিক অন্যান্য বিষয়গুলো বিসর্জন দিব। কারণ অদৃশ্য এমনসব সামাজিক কর্মকান্ড আছে, যা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে ও  হচ্ছে আদান প্রদান। সোস্যাল ডিসটেন্স শব্দটি পশ্চ্যাতের জন্য যথাযথ হলেও বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে শারীরিক দূরত্ব বজায় শব্দটি শ্রেয়। তা এখন আমাদের উপলদ্বিতে এসেছে।

গত ৮এপ্রিল শেরপুর সদর হাসপাতালে দুই করোনা আক্রান্ত রোগীকে নিয়ে তিন এমপির মধ্যে শুরু হয় যুদ্ধ। নিজ নির্বাচনী এলাকার হাসপাতালে তারা এসব রোগী ভর্তি করতে নারাজ। যা পত্র-পত্রিকার শিরোনাম হয়। এঘটনা থেকে সহজে অনুমেয় দেশব্যাপী করোনা আক্রান্ত ও সম্ভাব্য রোগীদের অবহেলা, অবজ্ঞার বিষয়টি। গ্রামগুলোতে লকডাউনের নামে বাঁশের স্থায়ী বেড়া দিয়ে যেভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে তা ভয়াবহ। জরুরী প্রয়োজনে এম্ব্যুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের বিষয়টিও কারো মাথায় নেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, করোনায় বাসাবাড়িতে ধর্মীয় কর্মকান্ড বেড়েছে সত্য। কিন্তু সামাজিক কর্মকান্ড এই ধর্মীয় বিধিবিধান কতিপয় ক্ষেত্রে হচ্ছে উপেক্ষিত। জনগনকে জিম্মি করে অহেতুক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, রিলিফ চুরি, চাঁদাবাজী অবশ্যই গর্হিত অপরাধ। এখন এর সাথে যোগ হয়েছে সর্দি-কাশি ও করোনা রোগীর প্রতি ঘৃণা, অবহেলা ও অমানবিক আচরণ। যা দেখলে ও পর্যালোচনা করলে প্রশ্ন জাগে এটাইকি আমাদের সামাজিক রীতিনীতি? এটাই কি ইসলামী মূল্যবোধ? পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এই করোনা রোগী এ বিষয় এধরনের ইতিবাচক সংবাদগুলো আমাদের কি মেসেজে দিচ্ছে ?
নজরুল ইসলাম (৫৫) কুমিল্লা দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের মুদাফর্দি গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকার মিরপুরে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। তিন দিন আগে করোনা উপসর্গ নিয়ে নিজ বাড়িতে আসেন তিনি। শরীরে উপসর্গ থাকায় নিজের স্ত্রী ও সন্তানরা বাড়িতে জায়গা না দিয়ে তাকে ঢাকায় চলে যেতে বলেন। তখন রাত গভীর। নজরুল নিরুপায় হয়ে বোনের বাড়ি বারইকান্দি গ্রামে আশ্রয় নেন। ৬ মে স্বাস্থ্যের অবনতি হলে বিষয়টি দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবহিত করা হয়। চিকিৎকরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই মারা যান তিনি। শেষ বিদায়ের সময় নজরুল মুখে স্ত্রী-সন্তানের পানিও পাননি। তার বিদায়ে করেননি কেউ মাতম । সন্তানের কাঁধে তার লাশ যায়নি কবরস্থানে । পড়েনি কবরে স্বজনদের হাতের মাটি। দোয়া-মিলাদ তো দূরের বিষয়। অথচ জীবনের সব রোজগার ব্যয় করেছেন তিনি এই স্ত্রী-সন্তানদের পেছনে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নাজমুল নামে করোনায় আক্রান্ত যুবক ভাড়াটিয়াকে মধ্যরাতে মারধর করে রাস্তায় বের করে দেয় ৬ মে রাতে। নাজমুল একটি মসজিদের সামনে রিকশায় বসে কান্নাকাটি করতে থাকে। ময়মনসিংহের বাসিন্দা আবু সিদ্দিকের ছেলে নাজুমল স্থানীয় সিটি গ্রুপে চাকরি করার পাশাপাশি অধ্যায়নরত।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ৮মে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যায় তারেক (৩০)। একমুঠো মাটিও তার কবরে ফেলেননি কোনো স্বজন। জানাজায় তারেকের মামা ছাড়া আর কোনো স্বজন অংশ নেননি। এলাকার লোকজন লাশ দাফনে বাধা দিলে নোয়াখালী-১ চাটখিল-সোনাইমুড়ী আসনের সংসদ সদস্য এইচ এম ইব্রাহীমকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকায় একটি বাড়ির চতুর্থ তলায় বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন খোকনসহ। এর মধ্যেই অবস্থা গুরুতর হয় তার।
খোকন সাহার স্ত্রী তৃষা সাহা বলেন, ২৬ এপ্রিল ‘অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় আছিল। আমরা নিচে নামানোর চেষ্টা করতেছিলাম। সবাইকে ডাকছি। একটা লোকও আসে নাই। কেউ নাকি ধরবে না। আমি আমার শাশুড়ি আর আমার মেয়েকে নিয়ে তাকে ধরে নামানোর চেষ্টা করি। তিন তলার ভাড়াটিয়ার কাছে আমার মেয়ে পানি চাইছিল। ধমক দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় ভাড়াটিয়া।’ সিঁড়িতে যখন খোকন সাহা ছটফট করছিলেন। তখন সন্তানের এমন অবস্থা দেখে বৃদ্ধা মা দৌড়ে চার তালায় গিয়ে পানি নিয়ে আসেন। মুখে পানি দেওয়া মাত্র প্রাণ যায় খোকন সাহার। এরপর প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানেই পড়ে থাকে মৃতদেহ। আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেননি।
১৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ইউনানি চিকিৎসার পথিকৃৎ ডা. কৈলাস বণিক করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। তিনি ১০ দিন যাবৎ জ্বর, সর্দি, কাশি ও তিন দিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। এ অবস্থায় কোনো আত্মীয়স্বজনও এগিয়ে আসেননি মৃতদেহ সৎকারে।
একই দিন ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা যান সিপিবির নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড সেক্রেটারি বিকাশ সাহা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন শুনে আত্মীয়স্বজন কেউ মৃতদেহ দাহ করতে এগিয়ে আসেননি।
৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সংগীতজগতের আলোচিত মুখ ‘হিরো লিসান’ মারা যান। শহরের দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে তার মৃতদেহ একটি অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর চেষ্টা করলে আশপাশের লোকজনের বাধায় সেটা ফেলে রেখেই চলে যান চালক। ওই সময় পরিবারের লোকজন ও প্রতিবেশিরা কেউ লাশ দেখতে আসেননি। ফলে মৃতদেহ পড়ে থাকে বাড়ির গেটের ভিতরেই।
টাঙ্গাইলের সখীপুরে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে এক মহিলাকে তার সন্তান, স্বামী ও স্বজনরা বনের ভিতরে ফেলে দেয়। উল্লেখ্য ২৫শে এপ্রিল রাতে এই মহিলার চেঁচামেচির শব্দ শুনে এলাকার কয়েকজন মানুষ জঙ্গলের ভিতরে এগিয়ে যান। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে পুলিশ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই মহিলা উদ্ধার করে। তার বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে। স্বামী-সন্তান নিয়ে গাজীপুরের সালনায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। করোনা আক্রান্ত সন্দেহে স্বামী-সন্তান আর স্বজনরা বাড়ি নেওয়ার আশ্বাসে তাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে যান। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেই মহিলা করোনায় আক্রান্ত নন।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় করোনা সংক্রমিত হয়েছেন এমন সন্দেহে অশীতিপর বৃদ্ধা মাকে গ্রামছাড়া করে জন্মদাতা ছেলে ও পুত্রবধু। অসহায় ওই বৃদ্ধা চার দিন খাবার আর আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। বৃদ্ধা অমৃতবালা জানান, হোমকোয়ারেন্টাইন অমান্য করে ঢাকাথেকে গ্রামে আসা এক প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়াটাই ছিল তার অপরাধ। তাই তার দুই ছেলে ও ছেলের বউয়েরা ঘরছাড়া করে।

আরো পড়ুন
error: Content is protected !!